মুহাররম ও আশুরার সঠিক ইতিহাস ও ফজিলত।

History and Virtues of the Month of Muharram

মুহাররম ও আশুরার সঠিক ইতিহাস ও ফযিলতঃ

মুহাররম মাস পরিচিতি


✱ মুহাররম মাস হচ্ছে হিজরি সনের প্রথম এবং একটি বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ মাস। এই মাস এতটাই মর্যাদাপূর্ণ যে কোনো কোনো নবীদের যুগে এই মাসে যুদ্ধ বিগ্রহও হারাম ছিলো। এই মাসের মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন " নিশ্চয়ই মাসসমূহের গণনা আল্লাহ তাআলার কাছে বারো মাস, সেদিন থেকে যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত, এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজেদের উপর জুলুম করো না। ( সূরা তাওবা  - ৩৬ ) যদিও কুরানে এ চারটি মাসের কথা বর্ণনা করা নেই কিন্তু সহিহ বুখারি শরিফে এ মাস বলতে মুহাররম, রজব, জিলক্বদ ও জিলহজকে বুঝানো হয়েছে। ( সহিহ বুখারি - ২৯৫৮ )

আশুরা


✱ আশুরা হচ্ছে মুহাররম মাস সম্মানিত হওয়ার একটি অন্যতম কারণ। পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকেই এই দিনে ঘটে এসেছে অনেক অনেক হৃদয়বিদারক ও ঐতিহাসিক ঘটনা। আশুরার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস হচ্ছে- হযরত মুসা ( আ ) এর ফেরআউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি লাভ। হাদিস শরিফে আছে, " হযরত ইবনে আব্বাস ( রা ) থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন, মহানবী ( স ) যখন হিজরত করে মদিনায় পৌঁছেন তখন তিনি দেখলেন যে ইহুদি সম্প্রদায় আশুরার দিনে রোজা পালন করতেছে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা আশুরার দিনে রোজা কেন রাখছো? তারা বলল এই দিনটি অনেক বরকতময়। এই দিনে মহান আল্লাহ মুসা ( আ ) ও বনি ইসরাইল সম্প্রদায়কে ফেরআউনের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেছিলেন আর ফেরআউন ও তার বাহিনীকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। এর শুকরিয়াস্বরূপ মুসা ( আ ) এই দিনে রোজা রাখতেন। তাই আমরাও রোজা রাখি। মহানবী ( স ) বললেন মুসা ( আ ) এর শুকরিয়া অনুসরণে আমরা তাদের চেয়ে বেশি হকদার। অতঃপর তিনি রোজা রাখলেন এবং সকলে রোজা রাখতে নির্দেশ দিলেন।
আশুরার ইতিহাস বলতে অনেকেই মনে করেন যে হযরত হুসাইন ( রা ) এর শাহাদাতে কারবালার ইতিহাস। কিন্তু উল্লিখিত হাদিস থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে আশুরার ঐতিহ্য সেই প্রথম থেকেই চলে আসছে। সুতরাং আশুরার ঐতিহ্য প্রাচিনকাল থেকেই স্বীকৃত। তবে প্রাচিনকাল থেকে আশুরার দিনে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি কারবালার ময়দানের দুঃখজনক ঘটনাও মুসলমানের জন্য হৃদয়বিদারক।

প্রচলিত কুসংস্কার


✱ প্রতিবছর আশুরার দিনটি আমাদেরকে এই সকল দুঃখজনক ইতিহাসই মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু এই ইতিহাসকে ধারণ করতে গিয়ে অনেকেই এর অবমূল্যায়ন করছে। নিমজ্জিত হচ্ছে ভ্রষ্টতা ও কুসংস্কারের অন্ধকার অতল গহবরে। করছে নিজের মূল্যবান জীবনের অবমূল্যায়ন। এরা মনে করে যে মর্সিয়া পালনের মধ্যেই কারবালার আসল তাৎপর্য। কিন্তু এই ব্যথাভরা অন্তরে তারা একটা বারও চিন্তা করে না যে কী কারণে হযরত হুসাইন ( রা ) কারবালার ময়দানে নিজের জীবনকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ হযরত হুসাইন ( রা ) এর উদ্দেশ্য ও আদর্শ নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নই হতে পারতো তাকে ভালোবাসার সঠিক বহিঃপ্রকাশ। 
সুতরাং আমাদের সকলের দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হবে যে জীবন বিলিয়ে দিয়ে নয় বরং উনি যেই উদ্দেশ্যে জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন সেই উদ্দেশ্যই আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। উনার আদর্শে আমাদের জীবন গঠন করতে হবে।

আশুরার রোজা


✱ মুহাররমের ১০ তারিখের রোজার ফযিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হযরত জাবের ( রা ) হতে বর্ণিত , " রাসুল ( স ) আমাদের আশুরার রোজা রাখতে নির্দেশ দিতেন এবং এর প্রতি উৎসাহিত করতেন। এ বিষয়ে তিনি নিয়মিত খবরাখবর নিতেন। আর যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হলো তখন আশুরার রোজার ব্যাপারে তিনি আমাদেরকে নির্দেশও দিতেন না এবং নিষেধও করতেন না। আর এ বিষয়ে তিনি আর খবরাখবরও নিতেন না। ( মুসলিম - ১১২৮ ) 

আর একটি হাদিসে এর গুরুত্ব এভাবে বর্ণ্না করা আছে। হযরত হাফসা ( রা ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম ( স ) চারটি কাজ কখনও ছেড়ে দিতেন না, তার মধ্যে একটি হলো আশুরার রোজা। ( নাসায়ি )
হযরত আবু মুসা আশআরি ( রা ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আশুরার দিন ইহুদিরা ঈদ পালন করতো। রাসুল করিম ( স ) সাহাবিদের ঐ দিন রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। ( বুখারি - ২০০৫ মুসলিম - ১১৩১ )
সুতরাং এ হাদিস থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে যদিও এই রোজা নফল কিন্তু অন্যান্য রোজার থেকে গুরুত্বপূর্ণ।


আশুরার রোজার ফযিলত


✱ রাসুলুল্লাহ ( স )  প্রতিবছরই আশুরার রোজা রাখতেন এবং সকলকে রাখার প্রতি উৎসাহিত করতেন। সুতরাং রাসুল ( স ) এর আনুগত্যের মধ্যেই সকলের কল্যাণ নিহিত। হাদিস শরিফে আশুরার রোজার অনেক ফযিলত বর্ণিত হয়েছে। 
হযরত আবু কাতাদা ( রা ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল ( স ) কে আশুরার রোজার ফযিলত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, এই রোজা বিগত বছরের সকল গুনাহকে মুছে দেয়। ( মুসলিম - ১১৬২ )
হযরত আবু হুরায়রা ( রা ) থেকে বর্ণিত, নবী করিম ( স ) বলেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে নিজ পরিবার পরিজনের মধ্যে ভালো খানাপিনার ব্যবস্থা করবে আল্লাহ পাক তার পুরো বছরের রিজিকে বরকত দান করবেন। ( তাবরানি - ৯৩০৩ )

✳️✳️✳️ অতএব, আসুন আমরা আশুরার ইতিহাসকে ধারণ করি এবং এর যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করি। মনে রাখতে হবে কোনোক্রমেই যাতে বাড়াবাড়ি না হয়।

Post a Comment

5 Comments

  1. অনেক কিছু জানতে পারলাম। ধন্যবাদ।

    ReplyDelete
  2. তথ্যপূর্ণ লেখা। চালিয়ে যান।

    ReplyDelete
  3. গুছানো লেখা।

    ReplyDelete
  4. vah,, khub valo laglo likha gulu pore 😊




    ReplyDelete